বুধবার, জুন ২৮, ২০১৭ ,১৩ আষাঢ় ১৪২৪
২৯ ডিসেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার , ৫ : ৩২ অপরাহ্ন

  • নতুন বছরে বাস্তবায়নের পথে স্বপ্নের শীতলক্ষ্যা সেতু

    x

    Decrease font Enlarge font

    01টাইমস নারায়ণগঞ্জ: নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই সৈয়দপুর-মদনগঞ্জ দিয়ে শীতলক্ষ্যা সেতুর কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হবে জানাগেছে।

    বৃহস্পতিবার ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় সচিবালয়ে ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্পের পরিচালক ইকবাল হোসেন।

    বৃহস্পতিবার ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণের ব্যাপার সকল কিছু চূড়ান্ত করা হয় এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রকল্পের ঠিকাদারের সাথে ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি আলোচনায় বসে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যাদেশ প্রদান করবেন।

    ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

    প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর সেতু নির্মাণের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান। গত ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি মারা গেলে তার শূন্য আসনে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হয়ে আসে তার ছোট ভাই সেলিম ওসমান। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহনের পর সেলিম ওসমান নাসিম ওসমানের অসম্পন্ন থাকা স্বপ্নকে বাস্তবায়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আসছিলেন। ফল প্রসূত ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা তৃতীয় সেতুর ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় উপস্থিত জনপ্রতিনিধি এবং আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা শীতলক্ষ্যা সেতুটি প্রয়াত নাসিম ওসমানের নামে নাম করনের দাবি করে ছিলেন।

    জানাগেছে, বৈদেশিক অর্থায়ন না পাওয়া, প্রকল্প পরিচালক বদলি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা ও রেলওয়ের জমি না পাওয়ার কারণে ৭ বছরে নারায়ণগঞ্জবাসীর বহুল প্রত্যাশিত শীতলক্ষ্যায় তৃতীয় সেতু প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছিল মাত্র ২১ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের প্রচেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জবাসীর স্বপ্নের এ সেতুর জট খুলেছে। পাওয়া গেছে সৌদি উন্নয়ন তহবিলের (এসএফডি) ৩৩২ কোটি টাকা ঋণ। এখন ২০২০ সালের আগেই সেতুটি নির্মিত হবে।

    শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম প্রান্তে সৈয়দপুর ও পূর্ব প্রান্তে মদনগঞ্জ সংযোগ করে চারলেন বিশিষ্ট সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌদি আরবের আর্থিক অনুদানে নির্মিত সেতুটি ১ হাজার ২৯০ মিটার দীর্ঘ। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর। তবে ২০২০ সালের আগেই শীতলক্ষ্যা নদীর উপরে তৃতীয় সেতু নির্মাণ করা হবে বলে জানায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। যেহেতু এসএফডি ঋণ পাওয়া গেছে এখন আর সেতুটি নির্মাণে কোনো বাধা নেই বলে জানা গেছে।

    প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এসএফডি’র ফান্ড না পাওয়ার কারণেই প্রকল্পের কাজ বিলম্ব হয়েছে। রেলওয়ের জমি পেতেও বিলম্ব হয়েছিল। এখন সব কিছুর অবসান হয়েছে। আমরা আশা করছি ২০২০ সালের মধেই সেতুটি নির্মাণ করতে পারবো। আমাদের সামনে আর কোনো বাধা নেই। রেলওয়ে জমি সংশ্লিষ্ট ডিসি অফিসকে বুঝিয়ে দিয়েছে।’

    অন্যদিকে সওজ সূত্র জানায়, সাত বছরে মোট ছয় বার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০১১ সালে সাইদুল হককে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর পর পর্যায়ক্রমে ছয়বার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়। পরিমল বিকাশ সূত্র ধরকে ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে দুই বার পরিবর্তন করা হয়। এছাড়াও এম ফিরোজ ইকবাল, দলির উদ্দিন ও মোহাম্মদ ইকবাল প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

    বর্তমানে মোহাম্মদ ইকবাল প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে আছেন। ফলে ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত একই পকল্পে ছয়জন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন। বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি কম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ছয় জন প্রকল্প পরিচালক বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

    যাদের কর্মকাল সর্বোচ্চ ১ বছর ৮ মাস ১০ দিন এবং সর্বনিম্ন ৩ মাস ছয় দিন। এভাবে ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদলি কাম্য নয় বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পের অগ্রগতির বদলে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যেই সাত বছর অতিক্রম করেছে।

    সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি নভেম্বর ২০১০ সালে অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৭৭ কোটি ৬২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। তৃতীয় সেতুটি ২০১৩ সালে নির্মাণ করার কথা ছিল। অথচ সাত বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২১ শতাংশ। এর পরে সেতুটি নির্মাণের সময় বৃদ্ধি করা হয় ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। একই সঙ্গে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৯ কোটি ৬৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। তৃতীয়ধাপে ব্যয় ব্যতিরেকে আবারও ছয় বছর সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে।

    সেতুটি নির্মাণে ৩২৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুসহ অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণের কথা ছিলো। এ কাজের দরপত্র প্রক্রিয়াকরণ করে ঠিকাদার নির্বাচনের জন্য উন্নয়ন সহযোগী সৌদি উন্নয়ন তহবিলের (এসএফডি) সম্মতি নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। অথচ এখন নতুন করে এসএফডি’র সঙ্গে সম্পন্ন ঋণচুক্তির মেয়াদ ২০১৮ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

    সড়ক বিভাগ ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, অথচ এর বিপরীতে প্রকৃত অর্জন মাত্র ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্জিত ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ অগ্রগতির মধ্যে সেতু নির্মাণের প্রাথমিক কার্যাদি থাকলেও মূল কোনো কার্যক্রম নেই। অথচ ৩৭৭ কোটি ৬২ লাখ টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে ৪৪৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করতেই প্রায় ৩বছর সময় লেগেছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এলএম ম্যাপ এবং প্রস্তাব তৈরি, ইউটিলিটি অপসারণ ও নক্সা তৈরির জন্য পরামর্শক বিলম্বে নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে সরকারি ভূমি অধিগ্রহণেও বিলম্ব হয়। বাংলাদেশ রেলওয়েকে অর্থ পরিশোধ করা হলেও তারা জমি হস্তান্তর করে বিলম্বে।

    প্রকল্পের আওতায় মোট ৩২ দশমিক ৭৭ একর ভূমি অধিগ্রহণের সংস্থান রয়েছে। ইতোমধেই ব্যক্তিমালিকানাধীন ১৯ দশমিক ৬০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ডিসি অফিসের মাধ্যমে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কাছে জমির দলিল হস্তান্তর করা হয়েছে। অথচ এক কোটি টাকা পরিশোধ করলেই ১১ একর জমি তিন বছর পরে হস্তান্তর করে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়। সেতুটি নির্মাণ না হওয়ার কারণে এলাকার জনগণের যাতায়াত, উৎপাদিত কৃষি ও অন্যান্য পণ্যসামগ্রী পরিবহনেও অসুবিধা হচ্ছে। কংক্রিটের সেতুটি নির্মিত হলে যানজটপূর্ণ ঢাকা মহানগরীকে বাইপাস করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-মাওয়া-খুলনা জাতীয় মহাসড়ক ব্যবহার করা যাবে। ফলে যানজট এড়িয়ে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াত সহজ হবে।