বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৯, ২০১৭ ,৪ কার্তিক ১৪২৪
০৬ জানুয়ারী ২০১৭ শুক্রবার , ৯ : ১৬ অপরাহ্ন

  • দিদি নাম্বার ওয়ান এবং একজন সেলিনা হায়াত আইভী!

    x

    Decrease font Enlarge font

    IVটাইমস নারায়ণগঞ্জ (মন্তব্য প্রতিবেদন): ছাত্রছাত্রীদের চূড়ান্ত ফলাফল দিয়ে তথাকথিত সেমিস্টার ব্রেকে যে কদিনের ছুটি পেয়েছিলাম তার কিছুদিন আমি ঘরে শুয়ে, বসে, টিভি দেখে, ফেসবুকিং করে , গল্পের বই পড়ে কাটিয়েছি । আমি এই প্রথম মন দিয়ে টানা তিনদিন একটা অনুষ্ঠান দেখেছি । অনুষ্ঠানটার নাম দিদি নাম্বার ওয়ান। পশ্চিমবঙ্গের জি বাংলা চ্যানেলের বহুল আলোচিত, হিট রিয়েলিটি শো ।

    আমি আমার ছাত্রীদের মুখে , অনেক বড় বোন, ভাবীদের মুখে এই অনুষ্ঠানটির নাম শুনেছি এবং বলা বাহুল্য প্রমোও দেখেছি। কি জন্য এই অনুষ্ঠানটা এতো লম্বা সময় ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছে দুই বাংলায়, সেটার একটা কারন আমি খুঁজে পেয়েছি (ইতিমধ্যে অনেকেই পেয়েছেন আমি জানি)।

    একই সময়ে নারায়ণগঞ্জের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের মত সেলিনা হায়াত আইভী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। এই দুটি ঘটনার কাল একই হবার কারনে আমি কোথায় যেন দিদি নাম্বার ওয়ানের নারী দর্শক এবং নারী ভোটারদের মধ্যে একটা মিল খুঁজে পেয়েছি। চোখ কপালে তোলার কিছু নাই আমি আমার ব্যাখ্যাটা দিচ্ছি।

    বাংলাদেশে যারা দিদি নাম্বার ওয়ান দেখেন তাদের একটা বড় অংশ গৃহিণী। না এটা আমার কোন গবেষণার নয়, অব্জারভেশনের ফল। তাদের মধ্যে শিক্ষিত, কম শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত অনেক গৃহিণীও আছেন। চাকরি করেন এমন নারীরাও দেখেন এই অনুষ্ঠানটি দেখেন অনেক পুরুষও। দিদি নাম্বার ওয়ানে অংশ নেয়া দিদিরাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গৃহিণী (আমি তিনদিনে যা দেখলাম)।

    সেখানে খেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এক একটা ফেসে দিদিরা বেশ ভাল ভাল উপহার পান; যেমন শাড়ি, গয়না, খাবার, ঘর সাজানোর জিনিস এবং আরও অনেক কিছু। এই দিদিরা আসলে যে দিদিরা এই অনুষ্ঠানটি দেখেন তাদের প্রতিনিধি। ঘরের কাজের ফাঁকে একটু অবসর করে দিদিরা খেলতে যান এবং গাদা গাদা গিফট নিয়ে ঘরে ফেরেন।

    আমাদের মা, বোনরা দিনের পর দিন ঘর সামলাচ্ছেন , স্বামী সন্তান সামলাচ্ছেন কোন ধরনের পারিশ্রমিক ছাড়া, উপহার ছাড়া । তাদের জীবনটা ঐ চার দেয়ালে সংসার সন্তানেই বন্দী। তাই দিদি নাম্বার ওয়ানের দিদিরা যখন খেলেন দর্শক দিদিদের মনে হয় তাঁরাই খেলছেন, তাঁরাই উপহার পাচ্ছেন। অংশগ্রহণকারী দিদিদের জায়গায় নিজেদের কল্পনা করে দর্শক দিদিরা তাঁদের দিনের পর দিন অপ্রাপ্তির যে কষ্টটুকু আছে সেটার কিছুটা লাঘব বা আবেগীয় নিঃসরণ ঘটান অর্থাৎ ‘ক্যাথারসিস’ হয় দিদিদের।

    ক্যাথারসিস থিওরির মাধ্যমে এরিস্টটল দেখিয়েছেন কিভাবে বিয়োগাত্মক নাটক মানুষের ইমোশনাল রিলিজে সাহায্য করে এবং সিগ্মুন্ড ফ্রয়েড দেখিয়েছেন কিভাবে সহিংস অনুষ্ঠান এর পরিবর্তে একটা হালকা অনুষ্ঠান একজনকে শান্ত থাকতে সাহায্য করে। এরিস্টটল বা সিগ্মুন্ড ফ্রয়েডেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ক্যাথারসিস থিওরী।

    ১৯৫১ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে মনোবিজ্ঞানে পিএইচডিধারী  ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক সিমুর ফেশব্যাক গণমাধ্যম ভিত্তিক এই তত্ত্বের আরও বিশদ বিবরণ দিয়েছেন  তাঁর গবেষনায়।  ১৯৬০ সাল থেকে তিনি গণমাধ্যমের সহিংসতা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন এবং গণযোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘ক্যাথারসিস হাইপথেসিসের’ জন্যই সমধিক পরিচিত।

    তিনি দেখিয়েছেন যে মানুষটি ব্যাক্তি জীবনে তার সাথে ঘটে যাওয়া কোন সহিংসতার প্রতিশোধ নিতে পারেনা সে গণমাধ্যমে (টেলিভিশন) প্রচারিত এই জাতীয় কোন মুভি বা নাটক দেখার মাধ্যমে সেই প্রতিশোধটা নিয়ে নেয় অর্থাৎ এক ধরনের আবেগীয় নিঃসরণ ঘটায় । এই তত্ত্বের মুল জায়গা সহিংসতা ভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান হলেও তিনি দেখিয়েছেন যে হালকা বিনোদন মূলক অনুষ্ঠান (দিদি নাম্বার ওয়ান) থেকে শুরু করে আমাদের প্রতিদিনের ব্যক্তি জীবন অব্দি এই তত্ত্বের বিস্তার এবং প্রভাব রয়েছে। আর তাই যে মা নিজে কোনদিন নাচ শিখতে চেয়ে শিখতে পারেননি সেটা নিজের মেয়েকে শিখানোর মাধ্যমে এক ধরনের সুখ পান অর্থাৎ ক্যাথারসিস ঘটান।  পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে তিনি পেন্সিল্ভেনিয়া ইউনিভার্সিটিতে যোগদান করেন। এবার নির্বাচনে  ভোটার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। যার মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬২ জন এবং নারী ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৯ জন। পার্থক্যটা  একেবারেই নগন্য। শুধুমাত্র পুরুষদের ভোটে  সেলিনা হায়াত আইভী জয়ী হননি। ঐ দুই লাখ ৩৫ হাজার নারী ভোটারের একটা বড় অংশও এখানে ছিলেন। যে সব নারী ভোটাররা তাঁকে ভোট দিয়েছেন তাদের একটা বড় অংশ দিদি নাম্বার ওয়ানের দর্শক । এই ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৯ জন কোন বিশেষ দলের ভোটার ছিলেননা। তাঁরা নারী হিসেবে একজন নারীকে ভোট দিতে এসেছিলেন যে নারী তাদের বঞ্চিত জীবনের একজন প্রতিনিধি।

    সেলিনা হায়াত কার ব্যানারে নির্বাচন করছেন সেটাও হয়তো তাদের কাছে মুখ্য ছিলনা এখানে। আসলে দিদিদের হাত ধরে একজন দিদির বিজয় হয়েছে, ভোটার দিদিরা ভোট দিয়ে একজন আইভীকে বিজয়ী করার মাধ্যমে নিজেরা বিজয়ী হয়েছেন অনেকাংশে নিত্যদিন পূরণ না হওয়া অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়নে একজন রূপকারকে নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁরা ক্যাথারসিস ঘটিয়েছেন, একজন দিদিকেই করেছেন নাম্বার ওয়ান।

    লেখক: কামরুন নাহার (রুমা)

    জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি