সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৭ ,৯ আশ্বিন ১৪২৪
১৫ জানুয়ারী ২০১৭ রবিবার , ১০ : ০৮ অপরাহ্ন

  • মরার উপর ছড়ার ঘা পড়ুক -মোহাম্মদ নেয়ামত উল্লাহ

    x

    Decrease font Enlarge font

    • ছড়া বিষয়ক প্রবন্ধ
    • মোহাম্মদ নেয়ামত উল্লাহ
    • মরার উপর ছড়ার ঘা পড়ুক
    • Niyamot
    • ছড়া নিয়ে এ যাবতকালে অগণিত ছড়াকার নানা গদ্য-প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। নতুন আর কী লিখব! তবু এক সাহিত্য সম্পাদকের পীড়াপিরিতে ছড়ার উপর দু’চার লাইনের মন্থর-গতির ট্রেণ চালানোর চেষ্টা করবো। প্রথমেই বলা নেয়া ভাল, ছড়ার সার্জিকাল বিষয় এখানে কোন ক্লাশ হবে না। যা হবে ছড়াকে পাঠকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবার, ভাবপ্রকাশের মাধ্যম বানানোর এবং কিছু কিছু সচেতন পাঠককে ছড়ার ট্রেণের যাত্রী করে তোলার প্রয়াস। তাই ভাষাও হবে হাল্কা। কারণ সাহিত্যের একটি সহজবোধ্য বিষয়টি নিয়ে গুরুগম্ভীর ভাষার ব্যবহারের পক্ষপাতি নই। ছড়া কেমন হাল্কা, সহজবোধ্য এবং দ্রুত আবেদনময় তা একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। 
    • এজন্য ফিরে যাই মুখে মুখে প্রচলিত একটি ছড়ার কাছে-হাট্টি মাটিম টিম/তাদের খাড়া দু’টি শিং/তারা মাঠে পাড়ে ডিম/ হাট্টি মাটিম টিম।
    • হাট্টি মাটিম কোন ধরণের জীব তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চাইতে পাঠক এর ছন্দময়তা ও ভাষার সৌন্দর্য্যরে প্রতিই বেশি আকৃষ্ট।
    • অথবা সুকুমার রায়ের
    • বাবুরাম সাপুরে
    • বাবুরাম সাপুরে/কোথা যাস বাপুরে?/ আয় বাবা দেখে যা/ দুটো সাপ রেখে যা/ যে সাপের চোখ নেই/ শিং নেই নোখ নেই/ ছোটে নাকি হাঁেট না/ কাউকে যে কাটে না/ করে নাকে ফোঁস ফাঁস/ মারে নাকো ঢুঁশঢাঁশ/ নেই কোন উৎপাত/ খায় শুধু দুধ ভাত-/ সেই সাপ জ্যান্ত/ গোটা দুই আনত?/ তেড়ে মেরে ডান্ডা/ করে দেই ঠান্ডা।
    • অনেক সময় ছড়ার চিত্রকল্প কবিতাকেও ছাড়িয়ে যায়। সুকুমার রায়ের ‘গোঁফ চুরি’ ছড়াটিই তার প্রমাণ। তিনি লিখলেন
    • হেড অফিসের বড় বাবু লোকটি বড় শান্ত,
    • তাঁর যে এমন মাথার ব্যামো কেউ কখনো জানত?
    • দিব্যি ছিলেন খোশমেজাজে চেয়ারখানি চেপে,
    • একলা বসে ঝিমঝিমিয়ে হঠাৎ গেলেন ক্ষেপে!
    • আতকে উঠে হাত পা ছুঁড়ে চোখটি করে গোল,
    • হঠাৎ বলেন, ‘গেলুম গেলুম আমায় ধরে তোল’।
    • তাই শুনে কেউ বদ্যি ডাকে কেউ বা হাঁকে পুলিশ,
    • কেউবা বলে, ‘কামড়ে দেবে সাবধানেতে তুলিস’।
    • ব্যস্ত সবাই এদিক ওদিক করে ঘোরাঘুরি
    • বাবু হাঁকেন-‘ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি’!
    • (অসমাপ্ত)
    • সুকুমার বড়–য়া’র হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো ছড়াটির দিকে তাকালে হাল্কা, সহজবোধ্য এবং দ্রুত আবেদনময়তা বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। 
    • হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো/ সব ভেসে গ্যালো। ঢাকা থেকে পুবাইলে/ ফোন করি মোবাইলে। কতগুলো গরু এসে/ কত ধান খেলো?। হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো/ সব গরু খোঁয়াড়াতে/ জমা দিয়ে ফেলো। হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো/ তুমি নাকি সারাদিন/ ভ্যানগাড়ি ঠেলো/ ঘরে নাই চাল ডাল/ সরিষার তেলও/ লোন করে ফোন কিনে/ কোন খেলা খেলো?/ হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো
    • কারণ সাহিত্যের একটি শক্তিশালী শাখা হলো ছড়া। প্রাচীন যুগে ‘ছড়া’ সাহিত্যের মর্যাদা না পেলেও বর্তমানে সে তার প্রাপ্য সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এখনও অনেকেই ছড়া সাহিত্যকে শিশু সাহিত্যেরই একটি শাখা মনে করেন কিংবা সাহিত্যের মূল ধারায় ছড়াাকে স্বীকৃতি দিতে চান না। কেউ কেউ ছড়াকে কবিতা বলার পাশাপাশি আধুনিক গদ্য কবিতার যুগে এসব মিলযুক্ত কবিতা (অন্তমিল) বা পদ্যের অবস্থানকে হালকা করে দেখেন। তবে পদ্য (কবিতা) এবং ছড়ার মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে- পদ্যে রহস্যময়তা থাকে, কিন্তু ছড়ার বক্তব্য সহজবোধ্য ও স্পষ্ট।
    • প্রায় দেড় হাজার বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাসে ছড়ার বিকাশ ও উৎকর্ষ আমাদের বারবার চোখে পড়েছে। আদিতে সাহিত্য রচিত হতো মুখে মুখে এবং ছড়াই ছিল সাহিত্যের প্রথম শাখা বা সৃষ্টি। সাহিত্য লেখ্যরূপ আগে ছড়ায় মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করত। লোক সমাজে ছড়াই ছিল ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। গদ্য সাহিত্যের আগে তাই কেউ কেউ ছড়াকে লৌকিক সাহিত্য বলে বিবেচিত করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন ‘ছড়া শিশুদের কাব্য’। আধুনিক সাহিত্যিকগণ এসব অভিধান মানতে নারাজ। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন- ‘ছড়া সাহিত্যের গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ও নাটকের মতো একটি প্রয়োজনীয় শাখা। এই শাখাটি অন্যান্য শাখার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্যতা সহজেই ধরা পড়ে।
    • ভাগ বিভাজন ও শ্রেণীপ্রকার থাকলেও বাংলা সাহিত্যের আদি সৃষ্টি বা নিদর্শন চর্যাগীতির প্রথম পদটি ছড়ার মূল ছন্দ স্বরবৃত্তে লেখা এবং এটি ছন্দ-মিলে রচিত। এই পদটি বাংলা সাহিত্যের আদি ছড়া বললেও ভুল হবে না। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে যোগীন্দ্রনাথ সরকার লৌকিক ছড়াকে প্রথম গ্রন্থভুক্ত করেন এবং গ্রন্থটির নাম দেন ‘খুকুমণির ছড়া’। এই গ্রন্থটির ভূমিকায় সর্বপ্রথম রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী ছড়াকে সাহিত্যের একটি অন্যতম শাখা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থে সুকুমার রায়ের ছড়া সংকলিত করে ছড়ার গ্রহণযোগ্যতাকে মজবুত করেন। এ প্রসঙ্গে কবিগুরু বলেছেন, ‘সুদূর কাল থেকে আজ পর্যন্ত এই কাব্য (ছড়া) যারা আউড়িয়েছে এবং যারা শুনেছে তারা অর্থেও অতীত রস পেয়েছে। ছন্দতে ছবিতে মিলে একটা মোহ এনেছে তাদের মধ্যে। সেই জন্য অনেক নামজাদা কবিতার চেয়ে এর আয়ু বেড়ে চলেছে।’
    • এক সময় ছড়াকে মনে করা হতো শুধুই শিশু সাহিত্য। তবে এখন আর তা মনে করা হয় না, বাংলা সাহিত্যে ছড়া তাঁর নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে।
    • বাংলাদেশের ছড়া সাহিত্যের গৌরবের কাল হলো ষাটের দশক। এ সময় দেশের ছড়ার উর্বর চাষ হতে শুরু করে। যার ধারাবহিকতা এখনও বজায় রয়েছে। ছড়ার প্রাণ হলো ছন্দ ও মিল। সঠিক শব্দের প্রয়োগে ছড়ার বিষয় আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। একসময় ছড়া ছিল ধ্বনিনির্ভর ও অন্তমিল সংযুক্ত। কালের আবর্তে ছড়ার আধুনিকীকরণে ধ্বনি ও মিলের সাথে শব্দের সঠিক ব্যবহার ছড়াকে আরও ব্যঞ্জনাময় করে তুলেছে।  তবে হাল্কা এবং সহজ বিষয় নিয়েই নয়, ছড়া রচিত হয়েছে গভীর বিষয় নিয়েও। তবে প্রকাশ ছিল যথারীতিই হাল্কা।
    • অন্নদাশঙ্কর রায় লিখলেন-
    • তেলের শিশি ভাঙল বলে,/ খুকুর পরে রাগ করো?/ তোমরা যেসব বুড়ো খোকা,/ ভারত ভেঙে ভাগ করো?
    • তার বেলা
    • ভাঙছো প্রদেশ ভাঙছো জেলা/ জমিজমা ঘরবাড়ি/ পাটের আড়ত, ধানের গোলা/ কারখানা আর রেলগাড়ি-
    • তার বেলা?
    • ছড়ার শব্দ-ঝঙ্কারই পাঠককে বিমোহিত করে এবং ছড়ার চলার গতি আপন ছন্দে-আনন্দে। শব্দের সাঁকো তার আপনা-আপনি তৈরি হয়ে যায়। সে যাই হোক। ছড়ার আঙ্গিক বিষয়বস্তু ও ব্যাকরণগত দিক নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়নি। নিবন্ধটির শিরোনাম -‘মরার উপর ছড়ার ঘা পড়–ক’। বিষয়টি অনেকটা এ রকম-সাহিত্যের প্রতি যাদের আকর্ষন একেবারেই কম। অথবা দূর্বোধ্যতা এবং রহস্যময়তার কারণে অনেকে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার প্রতি বেশ অনীহ তাদের জন্য সাহিত্যের হাসপাতালে ছড়া হোক চিকিৎসার প্রথম ধাপ। এ হাসপাতালে আসা মরার উপর ছড়ার ঘা পড়লেই সেরে উঠে তরতর করে তিনি এগিয়ে যাবেন অন্যশাখায়। কারণ আদি এবং প্রথম পাঠ রেখে সামনের পাঠে কাউকে আগানো সম্ভব নয়। কারণ সাহিত্যের সকল শাখায়ই ছন্দ আছে, গতি আছে; আছে রস যা ছড়া হতেই উৎসারিত।
    • লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সংবাদচর্চা।