বুধবার, জানুয়ারী ১৮, ২০১৭ ,৫ মাঘ ১৪২৩
০৭ ডিসেম্বর ২০১৫ সোমবার , ৩ : ২০ অপরাহ্ন

  • ঊনিশ’শ একাত্তরে আমাদের এই দেশ একটি রাহুগ্রাসে পড়েছিল

    x

    Decrease font Enlarge font

    স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিচারণে একান্ত স্বাক্ষাৎকারে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: নূর আলম মিয়া

    02 টাইমস্ নারায়ণগঞ্জ: আমি তখন দশম শ্রেনীর ছাত্র। বয়স আনুমানিক ১৪ বছর। ঊনিশ’শ একাত্তরে আমাদের এই  দেশে একটি রাহুগ্রাস পড়েছিল। এই রাহুগ্রাস কাটাতেই আমরা ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও আমজনতা রাজপথে নেমেছিলাম। ভাষা আন্দোলন থেকেই বাংলাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের রুপ নেয়। ৭ মার্চ সেই সংগ্রামের একটা আবাস দেয়া হয়েছিল। ২৫ মাচের্র কাল রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর বর্বরোচিত হামলা শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানের ঐ নরপিচাঁশ হায়েনার দল। পরেরদিন ২৬ মার্চ বাংলাদেশের আনাচে কানাচে যুদ্ধের ডাক পরে যায়। তখন আমরা ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও আপামর জনতা এই বাংলাদেশের পবিত্র মাটিকে রক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে আশ্রয় নেই। আমাদের ছিল বাচাঁর তাগীদ এবং মাতৃভূমিকে সংরক্ষনের দায়িত্ব।

    বিজয়ের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে টাইমস্ নারায়ণগঞ্জকে  দেয়া একান্ত স্বাক্ষাৎকারে উপরোক্ত বর্ণনা দেন শহরের ১৫৬ কলেজ রোড  এলাকার মৃত আব্দুল কাদিরের ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নূর আলম মিয়া।

    চলমান বর্ণনায় তিনি আরও বলেন, আমি প্রথম ছিলাম ভারত মেলাঘরে ২নং সেক্টরের স্টুডেন্ট কোম্পানীর ২নং প্লাটুন কমান্ডার। পরে আমাকে এবং নারায়ণগঞ্জের কয়েকজন যোদ্ধা ছেলেকে রৌদ্রসাগর নামক নদীতে সাঁতারের প্রতিযোগিতা নেয়। সাঁতার প্রতিযোগিতায় যারা যারা টার্গেট সম্পন্ন করেছে সেই সমস্ত ছেলেদের দিয়ে নৌ কমান্ডার একটা প্লাটুন তৈরি করে। মেজর হায়দারের নেতৃত্বে ঐ প্লাটুনে আমরা যথারীতি নৌ কমান্ডারের ট্রেনিং নেই। আমাদেরকে মেলাঘর থেকে এক্স আর্মিদের সাথে অপারেশনে পাঠান যুদ্ধের অভিজ্ঞতার জন্য। কিছুদিন পর আমাদেরকে নিজ নিজ এলাকায় কিছু কিছু স্পটেও অপারেশনের জন্য পাঠানো হয়। এভাবে ৩-৪ বার বাংলাদেশ ভারত আসা যাওয়া করি।

    মেজর হায়দারের নির্দেশে ৪ জনের একটি দল নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে এবং সুইমিং প্লাটুনের (নৌ কমান্ডার) ৩ সদস্য আমার নেতৃত্বে মোট ৯ জনের একটি গ্রুপ নারায়ণগঞ্জ ৫নং ঘাট হতে ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগের মধ্যে জলে এবং স্থলে যুদ্ধ করি। আনুমানিক সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমরা খবর পেলাম, ডাঙ্গা বাজার থেকে একটা অস্ত্রের জাহাজ নারায়ণগঞ্জের দিকে আসছে। তাৎক্ষুনিক আমরা সেখানে অপারেশনের প্র¯ুÍতি নেই। তখন আমাদের গ্রুপ কমান্ডার নজরুল ইসলাম জাহাজের উপর ফায়ারের নির্দেশ দেন। তখন আমরা সবাই জাহাজের উপর গুলি বর্ষন করি। গুলি বর্ষনের অনেক সময় পর আমাদের অনুমান ছিল জাহাজের সবাই নিহত। যখন আমরা ফিরে আসার প্রস্তুতি নেই ঠিক তখনই ঐ জাহাজ থেকে পাল্টা আমাদের উপর গুলি চালায়। আামাদের গ্রুপের ৯ জনের মধ্যে ১জন গুলিতে আহত হয়। আহত ব্যাক্তিকে সাথে নিয়ে আমরা গ্রুপ কমান্ডার নজরুলের বাড়িতে যাই এবং তাকে প্রাথমিক চিকিৎসায় সুস্থ্য করে ভারত চলে যাই। ভারত যাবার পর আমরা শুনতে পারলাম। আমরা যেই জাহাজের উপর অপারেশন চালিয়েছিলাম ঐ জাহজের মধ্যে ৫জন পাক বাহিনী নিহত হয় এবং জাহাজ ডুবে যায়। শেষ মূর্হুতে পাক বাহিনীরা আমাদের উপর ক্ষীপ্ত হয়ে ডাঙ্গা বাজার গ্রাম আগুনে জালিয়ে দেয়।

    দেশ স্বাধীন হবার পর ছাত্র কালীন অবস্থায় মেজর হায়দার আমাকে কর্ণেল তাহের সাহেবের নিকট চাকরীর জন্য আবেদন পত্র দিয়ে পাঠায়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমি কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে সি ট্রাক ইউনিটে চাকরী করে আসছি। যা পরবর্তীতে,পি ও-২৮,এর নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালে বি আই ডাব্লিউ টি সি নামে রূপান্তরিত হয়।

    আমি বর্তমানে পি আর এলে আছি। স্ত্রী সহ তিন ছেলে নিয়ে আমার পাচঁজনের পরিবার। তবে আমার দুই ছেলে দেশের বাহিরে অধ্যায়নরত আছে এবং এক ছেলে বাংলাদেশে ভীমস্ ভার্সিটিতে বিবিএ শেষ বর্ষে অধ্যায়নরত আছে। সব মিলিয়ে আমি খুব সাধারণ ভাবে জীবন যাপন করছি।